বিরোধীদলে থাকতেই কবর দিতে বাধা, রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কী করবেন: তাসনিম জারা
৫৩ মিনিট আগে সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬
নিজেদের
নেতাদের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের কথা বললেও জামায়াতে ইসলামী অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ডা. তাসনিম জারা। তার প্রশ্ন—বিরোধীদলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ওনাদের
হাতে গেলে কী করবেন?
সোমবার
(২৬ অক্টোবর) সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে ডা.
তাসনিম জারা এসব কথা লেখেন।
পোস্টে
তিনি লেখেন, আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।
তিনি
এতে লেখেন, শনিবার সকাল দশটার দিকে ৮৭ বছর বয়সী
একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী, মারা গেছেন। সারাদিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সঙ্গে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা
দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।
তার
জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল উল্লেখ করে তাসনিম জারা লেখেন, মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে
ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি। পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া
যায়নি। যে কোদাল পাড়ার
ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত
ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।
অবশেষে মাঝরাতের পর পুলিশ পাহারায়,
মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া
সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে
ছিলেন না।
এনসিপির
সাবেক এই নেত্রী লেখেন,
এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন—মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে
দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই
নেতা বলেছেন—জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।
পোস্টে
তাসনিম জারা লেখেন, মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই
প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে। আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার
সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।’ আমরা মাফ করে দিই। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সব
হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে,
তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।
পোস্টে
তাসনিম জারা আরও লেখেন, ‘পিরোজপুরের মাটিতে দাফন করতে দেওয়া হবে না’ এই কথাটা ওনারা
এমনভাবে বলেন, যেন এই মাটির দলিল
ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই
অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে। ওনাদের একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামায়াত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা
ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায়
কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই, বিরোধীদলে থাকতেই, সেটা ভুলে গেছেন। একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার
বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে
দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর
কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান
পাবেন আর কার কবর
কোথায় হবে।
তিনি
লেখেন, নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার
কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ। ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের
কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সঙ্গে ও তার শোকসন্তপ্ত
পরিবারের সঙ্গে এমন আচরণ করেন। বিরোধীদলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা ওনাদের
হাতে গেলে কী করবেন?