মজুদদারির কারণে বাড়ছে জ্বালানি তেলের সংকট
২ ঘন্টা আগে রবিবার, মার্চ ২৯, ২০২৬
দেশে
জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার সরকারি আশ্বাসের মধ্যেও পেট্রল পাম্পগুলোতে
দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন, তেল না পাওয়ার অভিযোগ এবং হঠাৎ অস্থিরতা। অনুসন্ধানে দেখা
গেছে, জ্বালানি সংকটের মূল কারণ সরবরাহ ঘাটতি নয়, বরং অসাধু মজুদদারদের কৃত্রিম সংকট
সৃষ্টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা
বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় ভোগান্তিসহ বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের
চলমান অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে—এমন
আশঙ্কায় এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি তেল তেল মজুদ করছেন। শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
নয়, বাসাবাড়ি, গ্যারেজ এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও জ্বালানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে
বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও সাধারণ ভোক্তারা সংকটের মুখে পড়ছেন। দেশের বিভিন্ন
জেলায় প্রশাসনের অভিযানে অবৈধ মজুদের একাধিক ঘটনা ধরা পড়েছে।
শেরপুরে
একটি আবাসিক ভবনের নিচতলায় প্রায় ২৫ হাজার লিটার তেল মজুদ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের
পতেঙ্গা এলাকায় উদ্ধার হয়েছে প্রায় ছয় হাজার লিটার ডিজেল। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘তেল নেই’
লেখা একটি পাম্পে পাওয়া গেছে প্রায় ৯ হাজার ৭৮৩ লিটার জ্বালানি তেল। এ ছাড়া জামালপুর,
নেত্রকোনা, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় লাইসেন্স ছাড়া তেল মজুদ ও বেশি দামে বিক্রির
অভিযোগে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
শুধু
মজুদই নয়, কোথাও কোথাও তেল লুকিয়ে রেখে বিক্রি বন্ধ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
জামালপুরে এমনই এক ঘটনায় দুই হাজার ৫০০ লিটার তেল মজুদ রেখে বিক্রি বন্ধ রাখার প্রমাণ
পেয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে প্রশাসন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রির ব্যবস্থা
করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা
বলছেন, অবৈধভাবে জ্বালানি মজুদ করা শুধু বেআইনি নয়, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণও। পেট্রল ও
অকটেন অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ হওয়ায় বদ্ধ স্থানে এগুলো সংরক্ষণ করলে সামান্য আগুনের সংস্পর্শেই
বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের মতে, নিরাপত্তা মান না মেনে
জ্বালানি সংরক্ষণ প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই
পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রতিটি জেলায় ‘ভিজিল্যান্স টিম’
গঠন করে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সব পেট্রল পাম্পে একজন করে ‘ট্যাগ অফিসার’
নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাঁরা নিয়মিত কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন। তেলের ডিপোগুলোতে
নিরাপত্তা জোরদারে বিজিবি মোতায়েনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে
দেশব্যাপী অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, অবৈধ মজুদের সুনির্দিষ্ট তথ্য
দিলে তথ্যদাতাকে পুরস্কৃত করা হবে।
এ
বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান মো. রেজানুর
রহমান গতকাল শনিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অবৈধ মজুদদারিদের জন্য আমরা পাম্পগুলোতে বাড়তি
সরবরাহ করেও চাহিদা পূরণ করতে পারছি না। মার্চের ১ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত আগের বছরের
তুলনায় দ্বিগুণ সরবরাহ করেছি। আগের বছর এই সময় দৈনিক ১২ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন তেল সরবরাহ
করা হয়েছিল। এই বছরের একই সময়ে ২৪ হাজার মেট্রিক টনের বেশি তেল সরবরাহ করা হলেও সামাল
দেওয়া যায়নি। কারণ একদিকে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে তেল নিতে পাম্পে ভিড় করছেন, অন্যদিকে অবৈধ
মজুদদাররা তেল মজুদ করছেন। যার ফলে গত ৬ মার্চ থেকে ফের আগের বছরের মতো তেল সরবরাহ
দেওয়া হয়। পরে ঈদের আগে আগে আবার ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি তেল সরবরাহ দেওয়া হলেও পরিস্থিতির
কোনো উন্নতি দেখা যায়নি।’
বিপিসির
চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখন প্রতিটি জেলায় ‘ভিজিল্যান্স টিম’
গঠন করে নজরদারি করা হচ্ছে। পাম্পগুলোতে তদারকি বাড়াতে ‘ট্যাগ অফিসার’
নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাম্পে কতটুকু তেল বরাদ্দ পাওয়ার কথা ও কতটুকু পাচ্ছে
এগুলো তদারকি করবেন ট্যাগ অফিসাররা। পাশাপাশি সারা দেশেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
জরিমানা আদায়ের সঙ্গে করাদণ্ডও দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে যাঁরা অবৈধ মজুদদারির তথ্য দিচ্ছে,
তাঁদের এক লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।’
মো.
রেজানুর রহমান আরো বলেন, ‘ডিপো থেকে তেল নেওয়ার সময়ও এগিয়ে আনা হয়েছে। সকাল ৯ থেকে
বিকেল ৫টার পরিবর্তে এখন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টায় নামিয়ে আনা হয়েছে। সকাল সকাল পাম্পগুলোতে
তেল চলে আসবে, যানবাহনচালকদের ভোগান্তিও আগের চেয়ে কিছুটা কমবে। মানুষের ভোগান্তি লাঘবে
সব ধরনের প্রস্তুতি আমরা নিয়েছি। আশা করছি খুব দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে
চলে আসবে।’
এ
বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে
জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি চাপে পড়লেই অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুদদারির প্রবণতা বাড়ে।
কোথাও কোথাও পাম্পে তেল মজুদ রেখে ‘তেল নেই’ বলা হচ্ছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে তেল
সরিয়ে অন্যত্র অবৈধভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যা সামগ্রিক সংকটকে আরো তীব্র করছে।’
তিনি বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে নজরদারি আরো জোরদার করা প্রয়োজন।
প্রতিটি পেট্রল পাম্পে তেল উত্তোলন ও বিক্রির সুনির্দিষ্ট হিসাব থাকে, এই হিসাব নিয়মিত
মিলিয়ে দেখলে অনিয়ম অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।’
অধ্যাপক
তামিম আরো বলেন, ‘অননুমোদিত স্থানে তেল সংরক্ষণে পাম্পের মতো নিরাপত্তা মানদণ্ড মানা
হয় না। ফলে যেকোনো দুর্ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ ধরনের অবৈধ মজুদ বন্ধে সরকারকে
কঠোর অবস্থানে যেতে হবে। বর্তমানে পুলিশ, আনসার ও বিজিবি নিয়োজিত থাকলেও কোথাও ফাঁকফোকর
থাকলে তা চিহ্নিত করে মনিটরিং আরো বাড়ানো উচিত।’ একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি
তেলের চোরাচালান রোধেও নজরদারি জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি।
জ্বালানি
ও খনিজ সম্পদ বিভাগ থেকে গতকালও বলা হয়েছে, দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহে কোনো ঘাটতি
নেই এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল কেনা থেকে বিরত থাকার
জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে।