বাজার ছেয়ে গেছে ভারতের স্বাদহীন ইলিশ, পদ্মার ইলিশ বলে চলছে ভয়াবহ প্রতারণা
৩৯ মিনিট আগে সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬
ভারত
ও মিয়ানমার থেকে আমদানি করা ইলিশ বর্তমানে দেশের বাজারে উচ্চ মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।
আমদানিকারকদের হিসাব অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের কেজির মোট খরচ প্রায় ৫১৪
টাকা। কিন্তু বেনাপোলের বাজারে এই ইলিশের দাম ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি
পর্যন্ত উঠেছে।
অভিযোগ
উঠেছে যে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশকে পদ্মা, চাঁদপুর,
বরিশাল বা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ইলিশ হিসেবে বিক্রি করছেন। এর ফলে ক্রেতারা প্রতারণার
শিকার হচ্ছেন।
কাস্টমস
ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে
বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি করা হয়েছে। জুলাই মাসে
২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্ট মাসে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে।
এই
দুই মাসে আমদানি করা ইলিশের মোট মূল্য ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা হিসেবে দেখানো হয়েছে। জুলাইয়ে
আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১৪
টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিস ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল,
স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল, রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব ইলিশ আমদানি
করেছে।
আমদানিকারকদের
তথ্য অনুযায়ী, এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের কেজির মূল্য প্রায় ২৫২
টাকা। সরকারি শুল্ক ১৬২ টাকা এবং অন্যান্য খরচ যোগ করলে কেজিপ্রতি মোট খরচ প্রায় ৫১৪
টাকা দাঁড়ায়। কিন্তু বাজারে সেই মাছের দাম প্রায় তিন গুণ বেশি।
ব্যবসায়ীরা
জানাচ্ছেন, ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা ইলিশ দেখতে দেশি ইলিশের মতো হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের
পক্ষে পার্থক্য বোঝা কঠিন। রান্নার পর স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য বোঝা যায় বলে অনেক ক্রেতা
দাবি করছেন।
বেনাপোল
স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম জানিয়েছেন, চলতি
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি
হয়েছে। এসব মাছ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা
জানিয়েছেন, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আসা ইলিশ ভারতীয়। অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে আমদানি
করা ইলিশ সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করে। এদিকে, গত ২২ জুলাই বেনাপোল
স্থলবন্দর দিয়ে সাদা মাছের ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা ১২ কার্টনে প্রায় ৩৬০ কেজি ভারতীয়
ইলিশ জব্দ করে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
ক্রেতা
রেজা জানিয়েছেন, তিনি দেশি ইলিশ মনে করে একটি মাছ কিনেছিলেন। পরে রান্না করে খাওয়ার
পর স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য বুঝতে পারেন। তার মতে, দেখতে একই রকম হওয়ায় বিদেশি ও দেশি
ইলিশ আলাদা করা সাধারণ ক্রেতাদের জন্য কঠিন।
আরেক
ক্রেতা মিশুর অভিযোগ, কখনও চাঁদপুর, কখনও বরিশাল কিংবা চট্টগ্রামের ইলিশের পরিচয়ে
বিদেশি মাছ বিক্রি করা হচ্ছে। এভাবে চড়া দামে মাছ বিক্রি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা
করা হচ্ছে।
বাজারের
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কেজি ২০০ থেকে ১ কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি
ইলিশ প্রতি কেজি ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। একই আকারের কথিত
ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি দরে।
ব্যবসায়ীদের
দাবি, কম দামে বড় আকারের বিদেশি ইলিশ বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি কমেছে। এর ফলে
দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
আমদানিকারকদের
কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, তারা সরকারি নিয়ম মেনে এলসির মাধ্যমে
ভারত থেকে ইলিশ আমদানি করেছেন এবং শুল্ক পরিশোধ করেছেন। আমদানির পর আড়তদারদের কাছে
মাছ বিক্রি করেন তারা। এরপর বাজারে কীভাবে মাছ বিক্রি হচ্ছে, সেটি তাদের নিয়ন্ত্রণের
বাইরে।
ক্রেতাদের
দাবি, বিদেশি ইলিশকে দেশি ইলিশের নামে বিক্রি ঠেকাতে বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে
হবে। পাশাপাশি মাছের প্রকৃত উৎস ও আমদানির বৈধতা যাচাই করে প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের
বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।