হাসিনার ‘পিয়ন’ জাহাঙ্গীরের পরিবারের সম্পদ জব্দের নির্দেশ
১ ঘন্টা আগে মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২০, ২০২৬
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী জাহাঙ্গীর আলমের নামে থাকা প্রায় দুই কোটি টাকার জমি ও ফ্ল্যাট জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে থাকা সাতটি ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে অবরুদ্ধ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পৃথক আবেদনের শুনানি শেষে মঙ্গলবার ঢাকার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. সাব্বির ফয়েজ এ নির্দেশনা দেন।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন জানান, জাহাঙ্গীর আলমের নামে নোয়াখালীর সদর ও চাটখিল উপজেলায় মোট ৩৫ শতাংশ জমি রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য এক কোটি ৩৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪০ টাকা। পাশাপাশি ঢাকার মিরপুর এলাকায় অবস্থিত ১ হাজার ৩৮৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাটও জব্দের আদেশ দেওয়া হয়েছে, যার মূল্য ধরা হয়েছে ৪১ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
এ ছাড়া তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে পরিচালিত সাতটি ব্যাংক হিসাবে মোট এক কোটি তিন লাখ ৫৩ হাজার ৩৬৯ টাকা জমা রয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়। এসব হিসাবও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত থাকবে।
জমি, ফ্ল্যাট জব্দ এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আবেদন করেন দুদকের সহকারী পরিচালক পিয়াস পাল। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে ১৮ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তার ব্যক্তি মালিকানাধীন ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় ৬২৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে। সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে সম্পদ জব্দ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অন্যদিকে, কামরুন নাহারের বিরুদ্ধেও ছয় কোটি ৮০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। তার নামে থাকা সঞ্চয়ী ও ডিপিএস মিলিয়ে সাতটি হিসাবে প্রায় পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ায় দুদক পৃথক মামলা দায়ের করেছে। এ কারণেই ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের আবেদন করা হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে শেখ হাসিনা তার বাসায় কর্মরত এক পিয়নের অস্বাভাবিক সম্পদের কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, ওই ব্যক্তি কয়েকশ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন এবং তার জীবনযাপনে হেলিকপ্টার ব্যবহারের কথাও বলেন। যদিও সে সময় নাম প্রকাশ করা হয়নি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় এলে জাহাঙ্গীর আলমের নাম সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে তার ব্যাংক হিসাব স্থগিতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
জাহাঙ্গীর আলম টানা দুই মেয়াদে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিরোধী দলে থাকার সময়েও তিনি তার ব্যক্তিগত স্টাফ ছিলেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাসা থেকে খাবার ও পানি বহনের দায়িত্ব পালন করায় তিনি ‘পানি জাহাঙ্গীর’ নামেও পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে নানা অভিযোগের মুখে তাকে ওই পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলার খিলপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম একসময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হতে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেন। তবে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী পরিচয় ব্যবহার করে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হন এবং নোয়াখালী ও ঢাকায় উল্লেখযোগ্য সম্পদ গড়ে তোলেন। এ প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
জুলাইয়ের গণআন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দুদক তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের ঘোষণা দেয়। মামলার আগে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জাহাঙ্গীর আলম একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তান এবং একসময় জাতীয় সংসদ ভবনে দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তার আর্থিক অবস্থার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নোয়াখালী-১ (চাটখিল–সোনাইমুড়ী) আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় দেওয়া হলফনামায় তিনি নিজের নামে প্রায় ২১ কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তার স্ত্রী কামরুন নাহারের নামে প্রায় সাত কোটি ৩০ লাখ টাকার সম্পদের তথ্য উল্লেখ করা হয়।