অনৈতিক প্রস্তাবে অতিষ্ঠ হয়ে রুমমেটকে হত্যার পর ৭ টুকরা, পুলিশের লোমহর্ষক বর্ণনা
২ ঘন্টা আগে সোমবার, মার্চ ২, ২০২৬
রাজধানীর
মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষের কাটা হাত, পা, মাথাসহ বিভিন্ন অংশ উদ্ধার করেছে
পুলিশ। ইতোমধ্যে এ ঘটনার রহস্যও উদ্ঘাটন করে ফেলেছে পুলিশ। ঢাকার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে
পাওয়া যাওয়া মানবদেহের খণ্ড-বিখণ্ড অংশগুলো একই ব্যক্তির এবং এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ঘাতককে
গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।
তদন্তে
জানা গেছে, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বাসিন্দা ওবায়দুল্লাহকে নির্মমভাবে হত্যার পর তার
দেহ সাত টুকরো করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেন তারই রুমমেট শাহীন। মূলত, অনৈতিক
প্রস্তাব ও ঝগড়া-বিবাদের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার
(১ মার্চ) মিন্টো রোডে অবস্থিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত
‘রাজধানীতে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার রহস্য উদঘাটন: ঘাতক গ্রেফতার’
সংক্রান্ত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব জানান মতিঝিল বিভাগের ডিসি হারুন-অর-রশীদ।
হারুন-অর-রশীদ
বলেন, নিহত ওবায়দুল্লাহর দেহের একটি অংশ এখনো পাওয়া যায়নি। আমিনবাজারের ব্রিজ থেকে
সেই অংশটি ফেলে দেওয়া হয়েছিল। সেটি উদ্ধারে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। ওবায়দুল্লাহ
একটি হোমিওপ্যাথি প্রতিষ্ঠানে মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করতেন এবং শাহীন হোটেল হিরাঝিলে
চাকরি করতেন। তিনি বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পারি, শাহীন ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৮টার
দিকে ওবায়দুল্লাহকে হত্যা করে। পরে রাত ৯টার পর বিভিন্ন জায়গায় লাশের খণ্ডিত দেহাবশেষ
ফেলে দেওয়া হয়। ওবায়দুল্লাহ রাতে তাকে সিগারেট নিয়ে আসতে বলেন। কিন্তু শাহীন জানায়,
তার কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই, আনতে পারবে না। তারা জসীম উদ্দীন রোডে বাসা ভাড়া নিয়ে
থাকতেন। শাহীন রাতে বাসায় ফিরলে আবার তাকে সিগারেট আনার জন্য পাঠানো হয়। সিগারেট নিয়ে
আসার পর আবার তাকে নানরুটি ও কাবাব আনতে পাঠানো হয়। কাবাব ও নানরুটি নিয়ে এলেও দেখা
যায়, ওবায়দুল্লাহ একাই তা খান।
রাতে
ঘুমানোর সময় ওবায়দুল্লাহ জোরে জোরে কথা বলছিলেন। যেহেতু শাহীন ক্লান্ত ছিলেন, তাই তিনি
বিরক্ত হচ্ছিলেন। একপর্যায়ে ঘুমানোর চেষ্টা করার সময় ফোনে ধীরে কথা বলার জন্য অনুরোধ
করলে তাদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে ওবায়দুল্লাহ শাহীনকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ
করেন। ওই রাতে একপর্যায়ে ওবায়দুল্লাহ গোসলখানায় কাপড় ধোয়া শুরু করলে শাহীন তার ঘাড়
ও গলায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। পরবর্তীতে নিজে বাঁচার জন্য মরদেহটি বিভিন্ন
অংশে খণ্ড করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়। হারুন-অর-রশীদ বলেন, নয়াপল্টনে আনন্দ কমিউনিটি
সেন্টারের বিপরীতে দুটি হাত, বায়তুল মোকাররমের একটি গেটের পাশে একটি পা এবং কমলাপুর
রেল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় মাথাটি ফেলা হয়। মতিঝিলে কমলাপুর এলাকায় ময়লা বোঝাই কনটেইনারে
ড্রামভর্তি দেহাংশ ফেলা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, বাকি অংশগুলো আমিনবাজার সালিপুর
ব্রিজ থেকে ফেলে দিয়েছে। সেখানে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একটি অংশ এরইমধ্যে পাওয়া গেছে,
আরেকটি অংশের সন্ধানে অভিযান চলছে।
শাহীন
হত্যা করেছে—এটি কীভাবে নিশ্চিত হলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
শাহীন সাইকেলে করে খণ্ডিত অংশ ফেলার সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। এছাড়া সে নিজেও ঘটনার
সম্পৃক্ততা স্বীকার করেছে। তার কাছ থেকে চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু ঝগড়া-বিবাদের
কারণেই হত্যা করা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, শাহীন জানিয়েছে,
মাঝে মাঝে ওবায়দুল্লাহ তাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিত। এই বিষয়টি সে নিতে পারতো না। অনেক
সময় রাতে শাহীনের রুমে ওবায়দুল্লাহ চলে যেত। তখন শাহীন তাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে
দরজা আটকে দিত।
হত্যাকাণ্ডের
পর শাহীনের আচরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিসি বলেন, হত্যার পরও শাহীন স্বাভাবিকভাবে চাকরি
করত এবং সবার সঙ্গে স্বাভাবিক আচরণ করত। তাকে হিরাঝিল হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
উল্লেখ্য,
শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষের কাটা হাত-পা ও মাথা উদ্ধার
করা হয়। শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ২টার দিকে কাকরাইলের স্কাউট ভবনের সামনে কালো
পলিথিনে মোড়ানো মানুষের একটি পা পাওয়া যায়। এরপর শনিবার সকাল পৌনে ১০টার দিকে জাতীয়
স্টেডিয়ামের ১ ও ৪ নম্বর গেটের মাঝামাঝি মার্কেটের সামনের সড়কে কালো পলিথিনে মোড়ানো
আরও দুটি হাত পাওয়া যায়। দুপুরে কমলাপুর রেল স্টেশন এলাকায় আরেকটি পা পাওয়া যায়।
নিহত
ওবায়দুল্লাহ নরসিংদীর শিবপুরের তাতার গ্রামের আব্দুল হামিদ মিয়ার ছেলে। তার মায়ের নাম
রানী বেগম। তিনি মতিঝিলের কবি জসীম উদ্দীন রোডের একটি ফ্ল্যাটে হিরাঝিল হোটেলের কর্মচারী
শাহীন আলমের সঙ্গে থাকতেন বলে জানানো হয়েছিল।